লক্ষাধিক মানুষের ভাগ্য একটি ব্রিজ এর উপর!
প্রকাশিত হয়েছে : ০১ আগস্ট ২০১৫ ইং, ৫:৪৬ অপরাহ্ণ | সংবাদটি ১২৫৪ বার পঠিত
কুলাউড়া প্রতিনিধি:: দাদা, এখানে একটি ব্রীজ না থাকার কারণে কত কষ্টে আছি। একটি ব্রীজের জন্য কত নেতার দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি, কত আন্দোলন করেছি। নির্বাচনের সময় এলে সব এমপি প্রার্থীরা আসেন, ব্রীজ নির্মাণ করে দেয়ার আশ্বাস দেন, কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর কেউ আর কথা রাখেন না, আমাদের এ দুঃখর কথা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।’ এ প্রতিবেদকের কাছে উপরোক্ত কথাগুলো বললেন-কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের মনু নদী তীরের বাসিন্দা কামাল মিয়া।
এ দুঃখ শুধু কামাল মিয়ার নয়, এ দুঃখ কুলাউড়া উপজেলার দক্ষিণ লংলার লক্ষাধিক মানুষের। তাদের ধারণা কুলাউড়া-পৃথিমপাশা-হাজীপুর-শরিফপুর সড়কের পৃথিমপাশা ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের রাজাপুর খেয়াঘাঠে মনু নদীর উপর একটি ব্রীজ বদলে দিতে পারে এ এলাকার লক্ষাধিক মানুষের ভাগ্য।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে নদী তীরবর্তী পৃথিমপাশা ও হাজীপুর ইউনিয়নের মধ্যবর্তী রাজাপুর নামক স্থানে সর্বস্তরের জনসাধারণ একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। একাধিকবার মৌলভীবাজার সড়ক বিভাগ সেতু নির্মাণের লক্ষে জরিপ কাজ চালায়। কিন্তু পরবর্তীতে তা থমকে যায়।
এছাড়াও এই খেয়াঘাঠ দিয়েই যাতায়াত করতে হয় সুখনাভি, মাদানগর, আলীনগর, আলীপুর, ভূইগাঁও, নিশ্চিন্তপুর, দত্তগ্রাম, সুলতানপুরসহ পৃথিমপাশা, হাজীপুর, শরিফপুর ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষকে। এই খেয়াঘাঠ দিয়ে শুকনো মৌসুমে বাঁশের সাকো দিয়ে যাতায়াত করলেও, বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে যাতায়াত করতে হয় নৌকা দিয়ে। অনেক সময় নৌকা ডুবে ঘটে দূর্ঘটনাও।
২০১২ সালে নিশ্চিনন্তপুর গ্রামের এক রোগীকে নিয়ে রবিরবাজারে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে আসা হলে খেয়াঘাটে নৌকা না পাওয়ার কারণে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। জানা যায়, মৌলভীবাজার সড়ক বিভাগের আওতাধীন কুলাউড়া উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণাঞ্চলের রাউৎগাঁও, পৃথিমপাশা, হাজীপুর হয়ে শরীফপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী চাতলাপুর চেকপোষ্ট পর্যন্ত প্রধান এ সড়কের দৈর্ঘ্য ২৮ দশমিক ৫০কিলোমিটার।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে বয়ে আসা খরস্রোতা মনুনদী প্রবাহমান। নদীটি মৌলভীবাজারের শেরপুরে গিয়ে কুশিয়ারা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। কিন্তু সড়কের ১৪ কিলোমিটার এলাকায় রাজাপুর নামক স্থানে সেতু না থাকায় উপজেলা সদর থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হাজীপুর ও শরীফপুর ইউনিয়ন। একদিকে সেতু নেই, অন্যদিকে ওই পারের ৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার সড়ক কাঁচা রয়েছে।
তাই এ দুই ইউনিয়নের জনসাধারণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় অনেক পিছিয়ে পড়েছে। যার প্রভাব শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক ভাবে পড়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। হাজীপুর ইউনিয়নের মাদানগরের বাসিন্দা জুনেদ আহমদ (৩২), মিফতাউর রহমান (২৯), ফরিদ উদ্দিন (৫৫) বলেন, অন্যান্য সমস্যা গুলো সমাধান সম্ভব, তবে একটি সেতু নির্মাণ না হওয়ায় আমরা উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ করতে পার্শ্ববর্তী কমলগঞ্জ উপজেলা হয়ে কুলাউড়া সদরে যেতে হয়।
এতে আমাদের সময়, অর্থ ও শ্রম বেশি দিতে হয়। অন্য ইউনিয়নের চাইতে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ছি। পৃথিমপাশা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ ও হাজীপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা কুলাউড়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি তালুকদার আব্দুল বাছিত বাচ্চু বলেন, সেতু হলে শুধু হাজীপুর পৃথিমপাশা নয় পার্শ্ববর্তী টিলাগাঁও, কর্মধা, রাউৎগাঁও এর সঙ্গে আঃন্তযোগাযোগ বৃদ্ধি হবে।
পানসহ কৃষি পণ্য সহজে জেলা সদরে বাজারজাতকরণ সম্ভব হবে। ২০১১ সালে হাজীপুরে একটি জনসভায় তৎকালীন চিফ হুইপ আব্দুস শহীদ এমপি সেতু নির্মাণের প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন। এর পূর্বে তৎকালীন স্থানীয় এমপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ ও নওয়াব আলী আব্বাছ খান প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
হাজীপুরের মেম্বার হেলাল আহমদ, শরীফপুর ইউনিয়নের মেম্বার গনেশ লাল গোয়ালা, দত্তগ্রামের বাসিন্দা শিক্ষক চিনু মিয়া, রবিরবাজারের ব্যবসায়ী বুরহান উদ্দিন, মনুনদী তীরবর্তী কলিরকোনা গ্রামের বাসিন্দা ক্ষেতমজুর নেতা সৈয়দ মোশারফ আলী বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত থাকায় কৃষকের উৎপাদিত পন্য সহজে বাজারজাত হয় না।
জরুরি চিকিৎসা সেবা নিতে আমাদের বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সেতু নির্মান হলে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরবর্তী উপজেলা সদরে সহজেই যাওয়া যেত, সেতু না থাকায় ৩৫-৩৮ কিলোমিটার সড়ক ঘুরে যেতে হয়। শিক্ষার্থী ফয়জুল হক, আবুল কালাম, শেখ সেজি, পিংকু দে, নওশাদ, অরূপ দে বলেন, নদীর উপর বাঁশের সাঁকো দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হই। অনেকবার পাঁ ফসকে বই-খাতা নিয়ে নদীতে পড়েছি। সেতু হলে ৫-৭ কিলোমিটার দূরবর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহজে যাওয়া যেত।
এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী উৎপল সামন্ত বলেন- সেতুটি নির্মাণের লক্ষে হাইড্রোলজি ও মরফোলজি স্টাডির জরিপ কাজ চলছে। সেপ্টেম্বরে রিপোর্ট আসার পর একনেকের অনুমোদন সাপেক্ষে সেতুটি নির্মানের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি জানান-প্রায় ২৭০মিটার দৈর্ঘ্য সেতুটি নির্মাণে দেড়’শ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে।


