জারিগানে মুখরিত বিশ্বনাথের গ্রামাঞ্চল
প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ অক্টোবর ২০১৫ ইং, ৫:৫৫ অপরাহ্ণ | সংবাদটি ৮৭১ বার পঠিত
তজম্মুল আলী রাজু:: প্রবাসী অধ্যুষিত বিশ্বনাথ উপজেলার গ্রামাঞ্চল এখন জারিগানে মুখরিত। বাংলাদেশের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বিলুপ্তপ্রায় এই জারিগানকে নতুন করে জাগিয়ে তুলছেন উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের সাধারণ মানুষজন। মহরম মাসের শুরু থেকে মাসের শেষ দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে এ গান। উৎসব ঘিরে যুবসমাজ আনন্দ নিয়ে পালন করে জারিগান। পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখতে যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে জারিগান। মরহম মাসের শেষের দিকে জমে উঠেছে ওই গান। কনকনে শীতের এই রাতে তারা বিভিন্ন গ্রামে, বিভিন্ন বাড়িতে জারি গানের আসর বসাচ্ছেন। কারবালার বিয়োগাত্মক ঘটনাকে স্মরণ করে সেই ঘটনার ধারাবাহিক বিবরণ সম্বলিত গান গেয়ে আসর মাতিয়ে রাখছেন গায়করা। গানের ফাকে ফাকে চলে চা পান, মাঝে মধ্যে পূতি পাঠ। এবং সকালে যথারীতি শিরনী বিতরণ।
বাড়ির উঠানের চারদিকে মাদুর পেতে গোল হয়ে বসেছেন দর্শক-শ্রোতা। গান ধরলেন শ্বাসরাম গ্রামের নুরুল হক লেচু মোল্লা। প্রথমে একক কণ্ঠে বললেন ‘হাতে কর হাতের কাম, মুখে লও আল্লার নাম। বলো মুমিন আল্ল¬াহ.. আল্লাহ..আল্ল¬াহ..’। এই আল্ল¬াহ আল্লাহ শব্দটি গায়ক দলসহ দর্শক শ্রোতাও সমস্বরে গেয়ে উঠলেন।
এবার মূল গানে প্রবেশ। “প্রথমে সালাম করি আল্ল¬াহ নবীজী/ সালাম মা ফাতিমার নামো ধরি/ সালাম আলী আসকর তওয়াসা নবী…। হুকুম আল¬ার না আছে খবর/ না পাইলাম পানি/ ইমাম সক্কল/ সালাম জানাই আমরা আল্ল¬াজির চরণ।”
“ইমাম হুছন কোলে লইয়া কান্দইন ফাতিমায়/ কে তারে মারিল বাচা ধস্তে করবলায়/ মাত্তম হায় আল্ল¬াহ হায়…। হায় হায় আছকরের লাশ লইয়া হুছন/ মুসলিমও আক্কলের বেটা বড় ফয়লওয়ান…।
এরকম হাজারো কথা নিয়ে কোন ধরণের বাদ্য বাজানো ছাড়াই সুরের মুর্চনায় আসর মাতোয়ারা করে রাখছেন জারির গায়ক দল। বেশির ভাগ গানের কথা সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত। গায়করাও সেই ভাষাতেই গান গেয়ে থাকেন। নুরুল হক লেচু মোল্লার সঙ্গে গানে অংশ নিলেন চেরাগ আলী, আলখাছ আলী, সুহেল মিয়া, সুনু মিয়া, হিরা মিয়া, নজরুল ইসলাম, তেরা মিয়া। রোববার রাত ১১ টায় শুরু হওয়া জারির আসর চলে ভোর পর্যন্ত। যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রাচীন এ প্রথাটি ধরে রেখেছেন এলাকার মানুষ। উপজেলার পূর্ব শ্বাসরাম, পশ্চিম শ্বাসরাম, কারিকোনা, সাধু গ্রাম, ধীতপুর, সরুয়ালা, বিশ্বনাথেরগাঁও, মুফতিরগাঁও, তাতিকোনা, দশদল কাদিপুর, কারিকোনা, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে জারি হচ্ছে প্রতি রাতেই।
পশ্চিম শ্বাসরাম গ্রামের নূরুল হক লেচু মোল্লা বলেন, মহরম মাসের প্রথম থেকে জারি শুরু হয় এবং চলে মাস শেষ হওয়া পর্যন্ত। প্রতি রাতেই কোন না কোন গ্রামে বা বাড়িতে জারির আসর বসছে। দূর দূরান্ত থেকেও অনেকে জারি শুনতে আসেন। কারণ বিশ্বনাথ ছাড়া অন্যে কোন স্থানে জারির প্রচলন নেই।
ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম বলেন, কালের পরিবর্তনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় জারি গান হারিয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্বনাথের বিভিন্ন গ্রামে এখনও শুনা যায় জারি গানের আওয়াজ। জারির আসরের জন্য আগে থেকে কোন প্রচার চালানো হয়না। কোন ধরণের মাইকিং, পোস্টারিংয়ের ব্যবস্থা নেই। একজন থেকে আরেকজন শুনে আসরে এসে উপস্থিত হন দর্শকরা। শীতকে উপেক্ষা করেও বৃদ্ধ যুবক বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষকে জারি গানের আসরে দেখা যায়।
যুক্তরাজ্য প্রবাসী মনির আলী বলেন, ছোট বেলায় জারি গান শুনেছি। প্রবাসে থাকাকালে জারির কথা মনে পড়ত। এবার অনেক দিন পর এসে জারি শুনলাম মনে হল সেই পরনো দিনে ফিরে গেছি।
জারি গানের বয়াতি আনোয়ার আলী বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে জারী গান করে আসছি। পুরনো প্রথা চালু রাখতে প্রতি রাত জারি গানের আসর বসে আমাদের এলাকায়। আমাদের আশপাশ গ্রাম ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে জারি গান করে থাকি।


