বাংলা সাহিত্যে শায়খে বিশ্বনাথী রাহ.’র অনন্য কীর্তি
প্রকাশিত হয়েছে : ২০ মে ২০২৫ ইং, ৫:৪৭ অপরাহ্ণ | সংবাদটি ১৪৫ বার পঠিত
আল্লামা শায়খ আশরাফ আলী বিশ্বনাথী রাহ. ছিলেন একাধারে রাজনীতিবিদ,শায়খুল হাদীস,শিক্ষাবিদ ও সুলেখক-সাহিত্যিক।জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক কেন্দ্রীয় সফল সভাপতি,জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া বিশ্বনাথ ও জামিয়া মাদানিয়া ক্বাওমিয়া মহিলা মাদরাসা বিশ্বনাথের প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম পরিচয়ের সাথে তাঁর আরেক পরিচয় -তিনি মাসিক আল ফারুকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। ছাত্রজীবন থেকে লেখালেখির সাথে সংপৃক্ত ছিলেন। তরজুমানে ইসলাম, জং এ করাচি ইত্যাদি পত্রিকায় নিয়মিত লেখতেন। ১৯৯৮ সালে তিনি সাহিত্য সাময়িকী মাসিক আল ফারুক প্রতিষ্ঠা করেন। আমৃত্যু তিনি পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন। তাঁর সম্পাদনায় পত্রিকাটির ৩৫টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। আল ফারুকের শুরুর সময়ে বাংলাদেশের আলেম সমাজে আজকের মতো মাতৃভাষার প্রতি সচেতনতা ছিলো না। মাদরাসাগুলোতে বাংলা চর্চা ছিলো না বললে চলে। সে সময়ে স্রোতের বিপরীতে যে কয়েকজন আলেম স্বীয় মাতৃভাষায় ইসলাম চর্চায় এগিয়ে এসেছিলেন শায়খে বিশ্বনাথী রাহ.তাদের অন্যতম। মওদুদী ইসলামের সংক্ষিপ্ত নমুনা(প্রকাশ কাল১৯৭০ইং) মাসিক আল ফারুক ছাড়াও তিনি সত্তরের দশকে (সম্ভবত প্রথম আলেম হিসেবে) মওদুদীবাদের বিরুদ্ধে বাংলা ভাষায় বই লেখেন। তখন মওদুদীবাদ সম্পর্কে আজকের মতো পরিস্কার ধারনা জনসাধারণের তো ছিলোই না এমনকি আলেম সমাজের অনেকে ধোঁকায় নিমজ্জিত ছিলেন। মাওলানা আশরাফ আলী মিয়াজানী দা.বা.’র বর্ণিত এই ঘটনা থেকে সেই সময়ের চিত্র অনুধাবন করা যেতে পারে। তিনি লিখেছেন- “ষাটের দশকের শেষের দিকের ঘটনা। আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী রহ.তখনও মাওলানা আবুল আলা মওদুদীর ভক্ত। মওদুদী মতবাদের ভ্রান্ত দিকগুলো তখনও তার সামনে উদ্ভাসিত হয়নি। এতে দেশের হকপন্থী উলামায়ে কেরামদের ন্যায় সিলেটের শীর্ষ উলামা হযরাত দারুণ ভাবে উদ্বিগ্ন। হযরত শায়খে বিশ্বনাথী রহ. হযরত শায়খে কৌড়িয়া রহ.এর নেতৃত্বে মাওলানা শফিকুল হক আকুনী রাহ. ও হযরত মাওলানা ওয়ারিস উদ্দীন মুহাদ্দিসে হাজীপুরী রাহ.সহ কানাইঘাট দারুল উলুম মাদরাসায় উপস্থিত হন। সাথে মওদুদী সাহেবের লেখা উর্দু পুস্তকাদিও রয়েছে। হযরত বায়মপুরী রহ.এর সাথে সাক্ষাতে উক্ত পুস্তকাদী তাঁর সামনে তুলে ধরা হয়। তিনি অবলোকনে শিহরিত হয়ে উঠেন। হযরত শায়খে বিশ্বনাথী রহ. কে সম্বোধন করে বলতে থাকেন-ওরে ডাকাত! এগুলো আমাকে আগে দেখাওনি কেন? আমি কি তোমাদের উর্দু পুস্তকাদি দেখার সময় পাই? সুবহানাল্লাহ! মওদুদী সাহেব কি এরূপ আক্বীদা পোষণ করেন? ইত্যাদি। হযরত শায়খে বিশ্বনাথী রহ. কে একাধিকবার এ ঘটনা অত্যন্ত আনন্দের সাথে উল্লেখ করতে আমার নিজ কানে শুনেছি”। সেই সময়ে শায়খে বিশ্বনাথী রাহ.আলেম ও জনসাধারণকে সচেতন করে তুলতে “মওদুদী ইসলামের সংক্ষিপ্ত নমুনা” বইটি রচনা করেন। সেই সময় বইটি বেশ সমাদৃতও হয়েছিলো। ইসলাম বনাম গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র(প্রকাশ-১৯৮৯ইং) তিনি ইসলামি রাজনীতি তথা খেলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন।দেশে বিদ্যমান গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের সাথে ইসলামের দ্বন্দ্ব কোথায়?সেটি তুলে ধরার পাশাপাশি ইসলামি দলসমূহের মধ্যে ঐক্যের ক্ষেত্রটিও এই বইয়ে তুলে ধরেছেন।অর্থাৎ তিনি মনে করতেন ইসলামি যে সব রাজনৈতিক দল রয়েছে সব দলের ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্র,সমাজতন্ত্রের বিলুপ্তির সংগ্রামে ‘ইত্তেহাদ মাআল ইখতেলাফ’ জরুরী। মাদরাসাতুল বানাতের পাঠ্য তালিকা ( প্রকাশ কাল১৯৯২ইং) নব্বইয়ের দশকে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মহিলা মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে।শায়খ নিজেও একটি মহিলা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন।কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় পুরুষের চেয়ে স্বতন্ত্র পাঠ্যসূচি মহিলা মাদরাসার জন্য হওয়ার প্রয়োজন পূরণে তিনি এই পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি (১৯৮৮) বৃটিশ-ভারত,পাকিস্থান,বাংলাদেশ এই তিন কালেই শায়খে বিশ্বনাথী রাহ. জমিয়তের সাথে জড়িত ছিলেন।পাক আমলে এসে পূর্ব পাকিস্থানে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রতিষ্ঠা,উত্তাণ ও বিস্তৃতি তাঁর হাত ধরেই হয়েছিলো।তিনি এই ত্রিকালে জমিয়তের অবস্থান,সংগ্রাম বিশেষত বাংলাদেশে সংগঠনিক যাত্রা ও পরবর্তি ইতিহাস তুলে ধরেছেন এই বইয়ে। মক্তব প্রথম পাঠ (১৯৮৩) শিশুদের বর্ণমালা শিক্ষায় ইসলামি ভাবধারার গুরুত্ব এখন সূর্যের ন্যায় পরিস্কার।অ-অজু আর অ-অজগর শিক্ষার ফারাক ও গন্থব্য বিশ্লেষন করারও এই সময়ে প্রয়োজন নেই। কিন্তু যে সময়ে আলেম সমাজ বাংলা বিমূখ তখন বাংলা বর্ণমালায় ইসলামি ভাবধারার প্রয়োজনীয়তা উপলব্দি করতে পেরেছিলেন শায়খে বিশ্বনাথী রাহ.।হাটহাজারী মাদরাসার শতবর্ষের সেরা একশ জনের ২৭নাম্বার জন,একজন জাতীয় রাজনীতিবিদ,বরেণ্য শায়খুল হাদীস হিসেবে দারসি কিতাবের শরাহ বা বিষয়ভিত্তিক বড় গ্রন্থ রচনা তাঁর কাছে প্রত্যাশা ছিলো।কিন্তু তিনি জাতির ভবিষ্যতের কথা মাথা রেখে ‘মক্তব প্রথম পাঠ’ নামে বই রচনা করেন এবং তাঁর জীবদ্দশায় বইটির ১০টি সংস্করণ(প্রায় ৫০হাজার কপি) প্রকাশ করে ফ্রি বিতরণ করেন। মুসাফিরের নামাজ (১৯৯৬) শায়খের চোখের সমস্যা প্রকট হলে তিনি ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হন।এক পর্যায়ে তাঁর চোখের অপারেশনের জরুরী হয়ে পড়ে।চোখের অপারেশন শেষে হাসপাতালে রেষ্টে থাকাকালীন সময়ে অপর এক রোগী শায়খের কাছে মুসাফিরের নামাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঐ রোগীকে অসুস্থতা নিয়েই কয়েকটি মাসআলা লিখে দেন।সুস্থ হওয়ার পরও মুসাফিরের নামাজ ও মাসায়িল সম্পর্কে মানুষের অজানার বিষয়টি তাঁকে পীড়া দিতে থাকে।সাধারণ মানুষের কল্যাণের চিন্তা থেকে এ সংক্রান্ত জরুরী মাসায়িলগুলো সম্বলিত ‘মুসাফিরের নামাজ’ বইটি রচনা করেন।সর্বস্থরের মানুষের কল্যাণ বিবেচনায় তাঁর জীবদ্দশায় বইটির ইংরেজি অনুবাদ সংযুক্ত করা হয়। স্বৃতির দর্পণে পূণ্যভূমি ইরাক(প্রকাশকাল ১৯৯৫ইং) ১৯৮৭ সালের ১০ জুন ইরাক সরকারের ধর্ম মন্ত্রনালয়ের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের শীর্ষ আলেমদের একটি কাফেলা ইরাক সফরে যান।কাফেলায় শায়খে বিশ্বনাথী রাহ.’র অন্যান্য সফর সঙ্গীরা হলেন আল্লামা সামছুদ্দীন কাসিমী রাহ.,মুফতি নুরুল্লাহ রাহ.মুফতি ওয়াক্কাস রাহ.,মাওলানা ফজলুর রহমান রাহ. ও মাওলানা শাহ কিশোরগঞ্জী রাহ.। ইরাক সরকারের প্রটোকলে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ এই সফরের অভিজ্ঞতা,ঐতিহাসিক স্থানসমূহের তথ্য- পরিচিতি এবং শিয়াবাদ নিয়ে “স্বৃতির দর্পণে পূণ্যভূমি ইরাক” বইটি রচনা করেন। এদারার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি সিলেট ও আসামের ক্বওমী মাদরাসাগুলোর সমন্বিত বোর্ড আযাদ দ্বীনি এদারার বিস্তৃতির সাথে যুবক বয়স থেকেই তিনি জড়িত ছিলেন।বিশেষত এদারার প্রকাশনা বিভাগের উন্নতিতে তিনি অনন্য অবদান রেখেছেন।এদারার সূচনা,বিস্তৃতির চোখে দেখা ঘটনাগুলোর সমন্বয়ে পরবর্তিদের জন্য রেখে গেছেন ‘এদারার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি’ বইটি। তারানায়ে জমিয়ত(প্রকাশ-২০০২ইং) শায়খের উপাধী বাবায়ে জমিয়ত তথা জমিয়ত জনক। এ দেশে সাদা-কালো পতাকাবাহী সংগঠন জমিয়তের উত্থানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।জমিয়তকে সিলেটের হাওয়া পাড়া থেকে রাজধানীর পল্টন আর জাতীয় সংসদ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে তাঁর জানি-মালি কোরবানী অনস্বীকর্য।তাঁর ধ্যান-জ্ঞান আচ্ছন্ন ছিলো জমিয়ত প্রেমে।সেই প্রেম থেকে লেখেন দীর্ঘ এক কবিতা “তারানায়ে জমিয়ত”। এ ছাড়াও ‘ইসলাম বিদ্বেষীদের কবলে ফত্ওয়া’ বইয়ের সম্পাদনা,পার্টিসিস্টেম ইলেকশন ফর্মূলা-প্রস্তাবনা সহ অগনিত প্রবন্ধ রচনা করে গেছেন।আল্লাহ হযরতের সকল খিদমাত ক্ববুল করুন।
লেখক-বিভাগীয় সম্পাদক মাসিক আল ফারুক



