শেরপুরে মাছের মেলায় অশ্লিল নৃত্য ও জুয়ার আসর
প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ জানুয়ারি ২০১৬ ইং, ৪:৪৭ অপরাহ্ণ | সংবাদটি ১২৮৫ বার পঠিত

শিপন আহমদ.ওসমানীনগর:: “পানে জর্দ্দা যেমন গুরায়-ফিরাই খাইরে চিবাইয়া/দেখনা খিলি কেমন নে/ না তর ঠোঁটে রাঙ্গাইয়া”/লাল লাল জাম্বুরা/ কে-কে খাবি তোরা/ খাইলে মনে হবে ঠিক যেন রসগোল্লা” এমন গানের শুরুতেই নদি নামের ২০-২১ বছরের সস্তা মেকাপে এক যুবতি মঞ্চে উঠেই শরীরে থাকা মিনি স্কাটটি খুলতে শুরু করে। পাশে মাইক্রোপন হাতে থাকা যুবকটি যুবতিকে পোশাক খোলতে সহযোগিতার পাশাপাশি গলা ফাটিয়ে জানান দিচ্ছে ভাই চলে আসুন, শেষ হতে চলছে ঢাকাইয়া মডেল নদির ঝুঁমুর ঝুঁমুর নাচ। আগে আসলে পাকা আম পাবেন,চালু চালু টিকেট কিনুন আপনাদের সামনে টিকেট কাউন্ডার খোলা আছে। সাহেবের চিয়ার ২শত টাকা আর বাংলার মাটি ১শত টাকা আসুন আসুন। শুরু হলো দ্বিতীয় গান। গাছে আম ধরেছে / কাঁচা আম ওরা বুঝি পাঁকতে দেবে না/আমি বেড়া দিয়েও পোলাপানদের যন্ত্রনায় আর শান্তি পাচ্ছি না” এমন গানে আবারও শুরু হলো একই দৃশ্য। দৃশ্যগুলো বুধবার দিবাগত রাতে সিলেট বিভাগের মিলনস্থ শেরপুরের ঐতিহ্য বাহী মাছের মেলার পুতুল নাচের প্যান্ডেলের ভিতরের দৃশ্য। শুধু অশ্লিল নৃত্য নয় নৃত্যের আসরের বাহিরের চারদিকে বসেছে শত শত জুয়ার আসর।
জানা যায়,হিন্দু সম্প্রদায়ের পৌষ সংক্রান্তিকে সামনে রেখে প্রতি বছরের মতো এবারও সিলেট বিভাগের মিলনস্থল কুশিয়ারা নদীর উত্তর তীর সিলেটের ওসমানীনগরের সীমান্তবর্তী শেরপুরে বুধবার থেকে শুরু হয়েছে ৩দিন ব্যাপি মাছের মেলা। কিন্তু নামে মাছে মেলা হলেও কাজে জুয়া আর পুতুল নাচের নামে অশ্লীল নৃত্যর মেলা বসিয়েছেন আয়োজকরা। অশ্লিল নৃত্যর জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে টিনশেড দিয়ে তৈরি প্রায় অর্ধ শতাধিক ঘর। এসব ঘরে উঠতি বয়সের মেয়েদের নিয়ে উলঙ্গ নৃত্য পরিবেশনসহ নাচ গানের পর শেষ রাতে দর কষা কষির মধ্যমে চলছে পতিতা ব্যবসা। জুয়ার জন্য খোলামেলাভাবে বসেছে প্রায় শত শত আসর। পাশাপাশি মদ, গাজা,হেরোইন ও ফেনসিডিল এর বিশেষ ব্যবস্থা। তাদের এ অশ্লীল নৃত্য প্রদর্শনীর টিকিটের অধিকাংশই উঠতি বয়সের তরুনদের হাতে দেখা যায়। টিকিটের মূল্যে ২০০ থেকে ১০০ টাকা ধরা হয়েছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর চোঁখের সামনে এমন অসামাজিকতা চললেও প্রশাসন দেখে না দেখার ভান করছে।
অন্যদিকে মেলাস্থল থেকে ৫০ গজের ভিতর রয়েছে পুলিশ ক্যাম্প। এলাকাবাসীর অভিযোগ পুলিশ প্রশাসন মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এসব অপকর্মের পাহাড়াদার হিসেবে কাজ করছে। সরকারি দলের প্রভাব খাটিয়ে নাম মাত্র টাকা দিয়ে মেলা ইজারা এনে প্রশাসনের উদাসীনতার দরুন গত দুই বছর ধরে ঐতিহ্যবাহি মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন যাত্রাদলকে পুতুল নাচের অনুমতি দিয়ে থাকেন ইজারাদাররা। আর এসব যাত্রাদল এবং জুয়ার আসর থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নেন ইজারাদার দলের সদস্যরা। পুতুল নাচের প্রতিটি প্যান্ডেল থেকে মেলা কমিটি এবার অগ্রিম ৬০-৭০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন। প্রতিটি জুয়ার আসর থেকে ২০-২৫ হাজার টাকা করে অগ্রিম নেয়া হয়েছে।
মেলায় আসা সিলেটের গুলজার আলীসহ অনেকই জানান মেলায় এসে ছিলাম মাছ কেনার জন্য । কিন্তু এখানে এসে যা দেখলাম সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি ইজারাদারকে ধিককার দিয়ে বলেন এসব অসামাজিকতা করে অর্থ উপার্জন করে খাওয়ার চেয়ে দুটো পান্তাভাত খেয়ে বেঁচে থাকাতাই ভাল।
একাধিক পুতুল নাচের দলের প্রধানরা জানান, প্রতিটি পেন্ডেল থেকে অগ্রিম ৭০ হাজার টাকা করে নিয়ে গেছেন ইজারাদারসহ তাদের সহযোগীরা। প্রতিটি জুয়ার আসরের মালিকদের কাছ থেকে অগ্রিম নিয়েছেন ২৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে মেলাকে কেন্দ্র করে আয়োজকরা প্রায় কোটি টাকা আয় হবে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্চ’ুক স্থানীয় একাধিক ব্যাবসায়ীরা জানান, প্রশাসনের সহযোগীতায় ইজারাদাররা যেমন খুশি তেমন করে এ মেলায় অশ্লিলতা সহ অসামাজিক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ যেন দেখার কেউ নেই।
মেলার ইজারাদার দলের প্রধান মিজানুর রহমান মিজানের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য গতকাল বৃহস্পতিবার একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তার ব্যবহৃত ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, শেরপুরের ঐতিহ্যবাহি মাছের মেলায় যাহাতে কোনো অসামাজিকতা না হয় এ জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর সুপারিশ করেছি।
শেরপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এস আই আবু সাঈদ বলেন, ঐতিহ্যবাহী এ মেলায় যাহাতে কোনো ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ না হয় সে জন্য আমরা সব সময় তৎপর রয়েছি। গত দুই দিনে একাধিকবার অভিযান চালিয়ে জুয়া ও অশ্লিল নৃত্যের আসর ভেঙে দিয়েছি।


