নিজস্ব সংবাদদাতা:: বিশ্বনাথে গত রবিবার যুক্তরাজ্য প্রবাসী মুরাদ আহমদের স্ত্রী সুজিনা বেগম কে হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। নিহতের মামা ক্বারী আব্দুন নূর বাদি হয়ে নিহতের সতিন সাবিনা বেগমসহ ৪ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
যেভাবে হত্যা করা হয় সুজিনাকে : গত রবিবার সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের পরপরই অতিথি পরিচয়ে হাতে বনফুলের মিষ্টির বক্স নিয়ে সুজিনার পিতার বাড়িতে আসে অজ্ঞাতনামা ৪ ঘাতক। ঘাতকরা দরজায় নক করলে সুজিনার মা তাদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা জানায় সুজিনার স্বামী মুরাদের পূর্ব পরিচিত। এরপর তাদেরকে বসতে দেওয়া হয় এবং তাদের জন্য সুজিনা ও তার মা রেজিয়া বেগম লাচ্ছি তৈরী করেন। কিন্ত আপ্যায়নের পূর্বেই ঘাতকরা ঝাপটে ধরে সুজিনাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করতে থাকে। এসময় সুজিনার মা এগিয়ে এলে তাকেও আঘাত করে ঘাতকরা। এক পর্যায়ে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত সুজিনা ও তার মা মাটিতে লুটিয়ে পড়লে ঘাতকরা পালিয়ে যায়। এসময় সুজিনার একমাত্র ছোট ভাই জহির উদ্দিন (১২) ঘর থেকে বের হয়ে চিৎকার শুরু করলে আশপাশ বাড়ির লোকজন ছুটে আসেন এবং সুজিনা ও তার মাকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে প্রেরণ করেন। কিন্ত হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেই সুজিনার মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্ত শেষে সোমবার রাতে সুজিনার মামার বাড়ি উপজেলার বাহাড়া দুভাগ গ্রামে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
সুজিনার পরিচয় : বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর (পশ্চিমপাড়া খালপাড়) গ্রামের মৃত হাজী আব্দুর রউফের মেয়ে ও জগন্নাথপুর উপজেলার শ্রীরামসি (সাতহাল) গ্রামের যুক্তরাজ্য প্রবাসী মুরাদ আহমদের ২য় স্ত্রী সুজিনা বেগম (১৯)। প্রায় সাড়ে ৩মাস পূর্বে মুরাদের সাথে বিয়ে হয় সুজিনার। বিয়ের পর থেকে সুজিনা তার মায়ের সাথে পিত্রালয়ে বসবাস করে আসছিলেন।
বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন সুজিনার মা : গুরুতর আহত অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় সুজিনার মা রেজিয়া বেগমকে। তিনি এখনো জানেন না আদরের মেয়ে তার কুল খালি করে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। রবিবারের ঘটনার লৌহমুর্ষ কাহিনী শুধুই তার চোঁেখর সামনে বেসে উঠছে। মেয়েকে কাছে না পেয়ে তিনি বার বার সজ্ঞা হারাচ্ছেন। আর আহাজারী করছেন।
হত্যার অভিযোগের তীর সতিনের দিকে : পথের কাটা দূর করতেই সুজিনাকে হত্যা করা হয়েছে! এমন অভিযোগ সুজিনার স্বজনদের। তাই অভিযোগের তীর এখন সুজিনার সতিন যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাবিনা বেগমের দিকে। সুজিনার আত্মীয়-স্বজন, এলাকাবাসী ও থানা পুলিশসহ অনেকেই ধারনা করছেন সুজিনাকে পরিকল্পিতভাবেই হত্যা করা হয়েছে। আর এর পিছনে হাত রয়েছে সুজিনার সতিন সাবিনার। এমনটাই ধারনা করছেন অনেকেই।
কে এই সাবিনা : জগন্নাথপুর উপজেলার আব্দুল্লাহপুর গ্রামের সুন্দর আলীর মেয়ে যুক্তরাজ্য প্রবাসী ছাবিনা বেগম। প্রায় ১৪ বছর পূর্বে পার্শ্ববর্তি শ্রীরামসি সাতহাল গ্রামের মুরাদ হোসেনের সাথে বিয়ে হয় সাবিনার। বিয়ের পর তাদের পরিবারের জন্ম নেয় একে একে ৩টি সন্তান। বিয়ের প্রায় ৫বছর পর থেকে সাবিনা-মুরাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় মনোমালিন্য। একপর্যায়ে পৃথক বসবাস শুরু করেন সাবিনা ও মুরাদ। কয়েক বছর ধরে এই বিরোধ আরো জটিল হয়ে পড়ে। এরপর প্রায় সাড়ে ৩মাস পূর্বে দেশে এসে সুজিনাকে বিয়ে করেন মুরাদ। আর এই বিয়েটাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি মুরাদের প্রথম স্ত্রী সাবিনা। মুরাদ বিয়ে করে লন্ডন চলে যাবার পর দেশে আসেন সাবিনাও। এসময় মুরাদ-সুজিনার বিয়ে ভেঙ্গে দিতে মুরাদের পরিবারকে চাপ সৃষ্টি করেন সাবিনা। কিন্ত এই চাপের কাছে কিছুতেই রাজি হননি মুরাদের পরিবার। এরপর প্রায় ১মাস দেশে অবস্থান করে লন্ডন চলে যান সাবিনা।
থানা পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, সাবিনার ৪ ভাইয়ের মধ্যে আপন ভাই সাজ্জাদ হোসেন (২৮) ও শাহাজান মিয়া (৩৩), সৎ ভাই শুকুর আলী (৫৫) ও জুনাব আলী (৫২)। জুনাব আলী এলাকার চিহিৃত একজন ডাকাত। তার বিরুদ্ধে একাধিক ডাকাতি মামলা রয়েছে। এছাড়া শাহজাহানকে তার মা নিজেই নেশাদ্রব্য সেবনের অভিযোগে জেলহাজতে প্রেরণ করেন। সে বর্তমানে জেলহাজতে আটক রয়েছে।
সাবিনা ও মুরাদের পরিবারের ভিন্ন বক্তব্য : মুরাদের ভাই নূরুল আমিন সুজা দাবি করছেন তার ভাই মুরাদ আহমদের সাথে কয়েক বছর ধরে তার (মুরাদের) ১ম স্ত্রী সাবিনা বেগমের কোন যোগাযোগ নেই। মুরাদ দেশে এসে সুজিনাকে বিয়ে করে লন্ডন চলে যাওয়ার পর সাবিনা দেশে আসেন। এবং তাদের পরিবারকে সুজিনার সাথে মুরাদের বিয়েটা যে কোন মূল্যে ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য চাপ দেন। এছাড়া সুজা জানান, লন্ডনে মুরাদের উপর মামলা দিয়ে তাকে জেল কাটিয়েছেন তার ১ম স্ত্রী সাবিনা বেগম। অন্যদিকে ভিন্ন বক্তব্য প্রদান করেছেন সাবিনার ভাই শুকুর মিয়ার স্ত্রী সুনামালা বেগম। তিনি দাবি করেন, সাবিনা-মুরাদের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। তিনি বলেন, ৩মাস পূর্বে মুরাদ দেশে আসার এক সপ্তাহ পর সাবিনাও দেশে আসেন। ঐ সময়ে সাবিনা-মুরাদ এক সাথে বসবাস করেছেন ও তাদের বাড়িতে আসা যাওয়া করেছেন মুরাদ।
হত্যাকারীদের গ্রেফতারে তৎপর পুলিশ : পুলিশ এখনও ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। তবে হর্ন্য হয়ে খুঁজছে পুলিশের বিশেষ টিম। বিশ্বনাথ থানার ওসি রফিকুল হোসেন বলেন, বিষয়টি তদন্তে আমরা অনেক এগিয়ে গেছি। আমাদের কাজ চলতেছে। কম সময়ে রহস্য বেরিয়ে আসবে।
প্রতিবাদের গ্রামবাসীর বৈঠক : সুজিনা হত্যার সুষ্ট তদন্তের দাবিতে মঙ্গলবার বিশ্বনাথে দৌলতপুর গ্রামবাসির উদ্যোগে জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। পুলিশকে সহযোহিতা করার জন্য বৈঠকে ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন দিলাওর হোসেন, তাহির আলী, আজম আলী, তাহিদ মিয়া।